ঢাকা, ২৫ নভেম্বর বুধবার, ২০২০ || ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
 নিউজ আপডেট:

ট্যুরিজমের নামে আদিবাসীদের উৎখাতঃ ধীরে ধীরেই পাহাড়-সমতলের লড়াই এক হবে।

ক্যাটাগরি : বাংলাদেশ প্রকাশিত: ৩৯১ঘণ্টা পূর্বে   ১৩৫


ট্যুরিজমের নামে আদিবাসীদের উৎখাতঃ ধীরে ধীরেই পাহাড়-সমতলের লড়াই এক হবে।


বিগত জানুয়ারি থেকে মার্চ ও লকডাউন পরবর্তী সময়ে সাজেক ভ্যালিতে যাওয়া একটি ক্রেজে পরিণত হয়েছে। মূলত বিভিন্ন ব্যবসায়িক ট্রাভেল গ্রুপ এই ক্রেজটি তৈরী করেছিলো। এই সময়ে সাজেক ঘুরে আসা অসংখ্য মানুষকেই বলতে শুনেছি তাঁরা ছবিতে যেমন সাজেক দেখেছে প্রকৃতপক্ষে সাজেককে সেভাবে দেখেনি তাঁরা। রুইলুই পাড়ায় এখন রিসোর্টের মেলা। পর্যটকদের চাপ সামাল দিতে রুইলুইপাড়া ছাড়িয়ে কংলাক পাড়ায়ও নাকি এখন বেশ কিছু রিসোর্ট উঠছে। ঘুরে আসা মানুষদের মুখে এমন কথা শুনে আর সাজেকগামী গাড়ির বহরের ছবি দেখে আমার মত অসংখ্য মানুষের বুখ খা খা করে ওঠাই স্বাভাবিক। ২০১৫ সালে যখন প্রথম সাজেক গিয়েছিলাম তখন আমার কাছে সাজেক ছিলো একাকী প্রকৃতির কাছে নিজেকে সপে দেওয়ার যায়গা। সেই সাজেকেই নাকি এখন রাতে ডিজে পার্টি হয়। হেলিপ্যাড থেকে শুরু করে কংলাক পাহাড় পুরো যায়গায় এখন শত শত মানুষের আনাগোণা। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, এই যে শত শত মানুষ প্রতিদিন সাজেকে যাচ্ছে তাঁদের অন্তত ১০ শতাংশও সাজেকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার কথা জানে না। জানে না সেখানকার আদিবাসীদের বসতভিটা রক্ষার লড়াইয়ের 
কিন্তু এইযে শত শত মানুষের আনাগোণা, এটিও এক প্রকার আশীর্বাদ বলে বিশ্বাস করি আমি। না, সেখানকার উন্নয়ন হচ্ছে, পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন হচ্ছে এসবকে আশীর্বাদ বলছি না আমি। শত শত মানুষের আনাগোণা বেশ কিছু মানুষের মনে কৌতুহলের জন্ম দিচ্ছে। মাস দুয়েক আগে সাজেকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও সেখানকার আদিবাসীদের লড়াই নিয়ে একটি একাডেমিক এসাইনমেন্ট ছিলো। সেটি করতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি ১০ কিংবা ১২ মাস আগে যেই পরিমান মানুষ সাজেকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা সম্পর্কে অবগত ছিলো, আজকে ১০ থেকে ১২ মাস পর তার অন্তত দ্বিগুন মানুষ রাষ্ট্রীয় সহিংসতা সম্পর্কে অবগত হয়েছে। এর কারণটি হলো এই মানুষরা সাজেকের হাইপ দেখেই গুগল স্কলারে সাজেক সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁরা প্রকৃত সত্যটি জানতে পেরেছে। যার ফলশ্রুতিতে যেই মানুষেরা কিছুদিন আগেও সাজেক বলতে বুঝতো কিছু রিসোর্ট আর সেনাবাহিনীর হেলিপ্যাড সেই মানুষেরাই আজকে সাজেক বলতে বুঝে সেখানকার আদিবাসীদের ভুমি রক্ষার লড়াইয়ের কথা।  যেই মানুষরা সাজেকের কথা কানে আসলেই মেঘের সাথে ছবি তোলার কথা ভাবতো সেই মানুষেরাই আজকে সাজেকের কথা কানে বাজলে অন্তত একবার রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নকে ধীক্কার দেয়। 
বিকাল থেকেই ফেসবুক টাইমলাইনে বান্দরবনের ম্রো আদিবাসীদের ভূমি দখল করে পর্যটন স্পট তৈরীর খবর ঘুরছে। বলা যায় লকডাউন পরবর্তী সময়ে বান্দরবনেও পর্যটকদের বেশ আনাগোণা শুরু হয়েছে।এর ফলেই ম্রোদের ভিটামাটি থেকে উতখাত করে পর্যটন স্পট নির্মানের পায়তারা। মূলত এতি পুজিবাদেরই একটি শিক্ষা। কোনো এক বামনেতা একদা বলেছিলেন পুজিবাদ মানুষ চিনে না, পুজিবাদ চিনে মুনাফা। ম্রোদের বসতবাড়ি থেকে উতখাত করে পর্যটন স্পট নির্মাণের অনেকগুলো উদ্দেশ্যের একটি এই মুনাফা। এই মুনাফার লোভ, পাহাড়ের আদিবাসীদের উতখাত এই বিষয়গুলো আমাকে বেশ পীড়া দিলেও আজ বিকাল থেকে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাসেরও কারণ হচ্ছে। একসময় অধিকাংশ বাঙালির কাছেই পাহাড়ের আদিবাসী মানেই ছিলো নাকবোচা, জঙ্গী। একসময় ফেসবুকে বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপে আদিবাসীদের পক্ষ নিয়ে কিছু বললেই একদল লোক লেখককে গালাগালি করার জন্য চলে আসতো। কিন্তু আজ বিকাল থেকে যখন ম্রো জনগোষ্ঠীর ভূমি রক্ষার আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়িয়েছে তখন থেকেই আমি বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপে দেখতে লাগলাম ৯৯ শতাংশ মানুষ আদিবাসীদের পক্ষে দাড়াচ্ছেন। ঘৃণা জানাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় দমণপীড়নকে। সংহতি জানাচ্ছেন ম্রো জনগোষ্ঠীর ভূমি রক্ষা আন্দোলনের সাথে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোকেই আমি একেকটি অর্জন বলতে চাই। এভাবেই রাষ্ট্র একে একে সমতলের বাসিন্দাদের জন্য পাহাড়ে আদিবাসীদের উৎখাত করে পর্যটন স্পট করবে, আর ধীরে ধীরে সমতলের বাসিন্দাদের আদিবাসী সম্পর্কে ভুল ধারনা ভাঙতে থাকবে। লেনিন বলেছিলেন, “এক পা এগোতে হলে দুই পা পিছাতে হয়।“ ঠিক এভাবেই আদিবাসীরা রক্ত দিবে, নিজ ভূমি হারাবে। কিন্তু একদিন তারাই সমতলের বাসিন্দাদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় দমণপীড়নের বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়াবে এই বিশ্বাস্টুকু আমি রাখতে চাই। 
পরিশেষে শ্রদ্ধা জানাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মুক্তির লক্ষে জীবন দেওয়া সকল শহীদের প্রতি, শ্রদ্ধা জানাই আদিবাসীদের মুক্তির জন্য লড়াইরত সকল সহযোদ্ধার প্রতি।   

-শাহরিয়ার রাফি

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন:
আরও সংবাদ পড়ুন
Search

সারাদেশের সংবাদ