জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নজিরবিহীন রায় ঘোষণা করেছে। বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন।
রায়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতিকে ঘটনাটিতে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার দায়ে প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে এ ধরনের কঠোর শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত এটিই প্রথম বলে উল্লেখ করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত শিক্ষকরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান এবং লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল (আসাদ)। একই মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতিকেও কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
গত বছরের ১৬ জুলাই ছাত্র আন্দোলনের সময়ে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নিহত হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন ও দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল মনে করেছে, তৎকালীন আন্দোলন দমাতে অভিযুক্তরা প্রত্যক্ষভাবে উসকানি ও সহায়তা প্রদান করেছিলেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল আরও উল্লেখ করেছে, নিরস্ত্র এক শিক্ষার্থীর ওপর গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় শিক্ষক এবং ছাত্র সংগঠনের দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক; তারা আবু সাঈদকে রক্ষায় এগিয়ে না এসে বরং আক্রমণকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যা আইন ও নৈতিকতার গুরুতর লঙ্ঘন।
বিচারক প্যানেল জানিয়েছেন, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের চেতনার প্রতি সম্মান রেখে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই রায় দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালানোর প্রবণতা রোধে এই রায় একটি শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করবে। আবু সাঈদ হত্যার পর দেশজুড়ে যে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে, তা পরে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়—এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী ও আইনজীবী আজকের রায়কে সেই আন্দোলনের অর্জন হিসেবে দেখছেন।
আবু সাঈদের পরিবার রায়ে সন্তোষ জানিয়ে বলেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে এই বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। অন্যদিকে দণ্ডিতদের পক্ষের আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। সরকার ও প্রসিকিউশন টিম এই রায়কে দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছে।