ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
নিউজ ডেস্ক :
প্রকাশিত : ০২:১৩ এএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Digital Solutions Ltd

আইফোনের লোভে অপ্রতিম হত্যা, তিন আসামির জবানবন্দিতে পরিকল্পনার বর্ণনা

প্রকাশিত : ০২:১৩ এএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে নিহত স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। ছবি: সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক :

ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির সূত্রে পরিচয়। এরপর ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি লোভ তৈরি হয় কয়েকজন তরুণের। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরে ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে তার আইফোন নেওয়া হয়। ফোন ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয় বলে আসামিদের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময় ও ঘটনার পর আসামিদের গতিবিধির বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯) এবং দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

আগেই করা হয়েছিল হত্যার পরিকল্পনা

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তিনটি জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তুহিনের বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

তুহিন জবানবন্দিতে দাবি করেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের লোভ তৈরি হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কাছাকাছি এলাকায় তাদের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তিনি জানান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটির জবানবন্দিতেও ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে সে পরিকল্পনার মূল দায় তুহিনের ওপর দিয়ে বলেছে, তুহিনই আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

অন্য কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার এক বন্ধু তাকে জানায়, তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

তিনটি জবানবন্দির বর্ণনা থেকে প্রাথমিকভাবে বোঝা যায়, হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি; আইফোনকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে আসামিরা দাবি করেছে।

টিকটকের মাধ্যমে যোগাযোগ

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। এ সময় অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। পরে তুহিন টিকটকে অপ্রতিমকে বার্তা পাঠান এবং একটি মুঠোফোন নম্বর পাওয়ার পর সেখানে কথা বলেন। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

তুহিনের বক্তব্য অনুযায়ী, অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল। তাদের ছবি তোলার কথা ছিল। ছবি তোলার এই পরিচয় ও যোগাযোগকেই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

আলাদা পথে পাহাড়ে যায় চারজন

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়েছেন তুহিন। তার দাবি, কৌশলে অপ্রতিমকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যান তিনি। ওই এলাকাটি নির্জন এবং পাহাড়টি তার চাচা শাহ আলমের বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তুহিন।

অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানায়, দুপুরের পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে বিকেলের দিকে সে আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। সেখানে যাওয়ার আগেই বন্ধুটিকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয় বলে তার বক্তব্য।

তৃতীয় কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার সঙ্গে ওই কিশোরের দেখা হয়। সেখানেই তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। পরে বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে গিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।

চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়—এ বিষয়টি তিন আসামির জবানবন্দিতেই প্রায় একইভাবে এসেছে।

আইফোন নেওয়ার পর শুরু হয় বিরোধ

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জবানবন্দিতে জানায়, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেয়।

তুহিনের বক্তব্যেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার দাবি, ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সেটি তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোনটি ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।

জবানবন্দিগুলোতে বলা হয়েছে, তুহিন প্রথমে অপ্রতিমকে থাপ্পড় মারেন। পরে পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুই কিশোরকেও মারধরে অংশ নিতে বলেন বলে বর্ণনা এসেছে।

দোকানে কর্মরত কিশোরটির বক্তব্য অনুযায়ী, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। তৃতীয় কিশোরও তুহিনের হাতেই প্রথম আঘাতের কথা জানিয়েছে।

হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তিন জবানবন্দিতে মিল রয়েছে। তুহিন আইফোনের প্রতি লোভের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য দুই কিশোরের বক্তব্যে বলা হয়েছে, ফোনটি বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

হত্যার পর আসামিদের গতিবিধিতে ভিন্নতা

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর কে কোথায় গিয়েছিল, সে বিষয়ে তিন আসামির জবানবন্দিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

তুহিনের দাবি, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুই কিশোর একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্য পথে বাড়িতে ফেরেন। দ্বিতীয় জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, দুই কিশোর একসঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে, আর তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয় কিশোরও জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে যান।

তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছে ছিল বলে তিনটি জবানবন্দিতেই উল্লেখ পাওয়া গেছে।

সিয়ামের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়ামের প্রসঙ্গও এসেছে। তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর বাড়িতে ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে পুরো ঘটনা জানান। এমনকি সিয়াম হত্যার পরিকল্পনার কথা আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিন দাবি করেছেন।

তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনায় সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ নেই। পুলিশ সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি; তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার পর অপ্রতিমকে খোঁজার দাবি

তুহিনের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যার পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরটি জানায়, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে অপ্রতিমকে খুঁজেছিল। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সে ঘটনাস্থলে যায়।

অন্য কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেয়। এরই মধ্যে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান

অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।

২০ সেপ্টেম্বর আদালতে তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, জবানবন্দিতে দেওয়া তথ্য অন্যান্য আলামত ও তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে যাচাই করা হবে। হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তিনটি জবানবন্দিতে অপ্রতিমের সঙ্গে পরিচয়, আইফোনের প্রতি লোভ, পূর্বপরিকল্পনা, নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন নেওয়া এবং হামলার মূল ঘটনাক্রমে মিল পাওয়া গেলেও আসামিদের ভূমিকা ও ঘটনার পরের গতিবিধি নিয়ে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

জাতীয় বিভাগের অন্যান্য খবর

 Somoyer Kotha
Follow Us

হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া

নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com

বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com

২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com