ঢাকা, ১০ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
প্রকাশিত : ০৪:০৭ এএম, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
Digital Solutions Ltd

‘মৃত্যুর পর কেউ মনে রাখবে না’, সেই নানা পাটেকরকেই আজ স্মরণ করছে সবাই

প্রকাশিত : ০৪:০৭ এএম, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

প্রয়াত ভারতীয় অভিনেতা নানা পাটেকর। ছবি: এএনআই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

‘একটা কথা মাথায় রাখবেন, আপনি মারা গেলে কেউ মনে রাখবে না। তাই যত দিন বেঁচে আছেন, আনন্দে থাকুন। অন্যের জন্য কিছু করতে পারলে করুন।’ ২০২৩ সালে মুম্বাইয়ে এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনদর্শন নিয়ে এভাবেই কথা বলেছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকর। তাঁর সেই কথাগুলো আজ নতুন করে মনে পড়ছে। ৭৫ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণে শোকাহত চলচ্চিত্রজগৎ ও অসংখ্য ভক্ত।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে ভারতের গোয়ার ডোনা পাউলায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নানা পাটেকর। তাঁর ছেলে মালহার পাটেকর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। অভিনেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, অভিনেতা অক্ষয় কুমারসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। পরে মহারাষ্ট্রের পুনের উপকণ্ঠে দোঞ্জে এলাকায় তাঁর খামারবাড়িতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

আঁকা থেকে অভিনয়ে

১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জঞ্জিরায় জন্মগ্রহণ করেন নানা পাটেকর। শৈশব থেকেই আর্থিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। সংসারের প্রয়োজনে কৈশোরে সিনেমার পোস্টার এঁকে উপার্জন করতেন। পরে মুম্বাইয়ের স্যার জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টসে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবনে নাটকের প্রতি আগ্রহ থেকেই মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন তিনি।

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নানার। শুরুতে ছোট ও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও আশির দশকে ‘অঙ্কুশ’, ‘প্রতিঘাত’, ‘মোহরে’ ও ‘সালাম বম্বে!’ ছবিতে অভিনয় করে পরিচিতি পান।

তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি ‘পরিন্দা’। বিধু বিনোদ চোপড়া পরিচালিত সিনেমাটিতে খলচরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি। এরপর ‘প্রহার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ ও ‘ওয়াজুদ’-এর মতো ছবিতে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।

১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ ছবিতে প্রতিবাদী চরিত্র ও সংলাপ পরিবেশনের ভঙ্গি দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান নানা। অন্যদিকে ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অভিনয় করে দেখিয়েছেন নিজের অভিনয়ের আরেকটি দিক।

হিন্দি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মারাঠি সিনেমা ও মঞ্চেও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মাননায় ভূষিত করে।

পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন

অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাতেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন নানা পাটেকর। ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে চরিত্রের গভীরে প্রবেশ এবং সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

অভিনেতা হিসেবে নিজের কাজের ধরন নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে নানা বলেছিলেন, একজন অভিনেতা পরিচালকের ওপর আস্থা রেখে নিজেকে চরিত্রের কাছে সমর্পণ করলে কাজ সহজ হয়ে যায়। চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার এই দক্ষতাই ছিল তাঁর অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও অভিনয়ে সক্রিয় ছিলেন নানা। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওটিটি মাধ্যমেও কাজ করেছেন তিনি। প্রকাশ ঝা পরিচালিত ‘সংকল্প’ সিরিজের মাধ্যমে এই মাধ্যমে তাঁর অভিষেক ঘটে।

প্রচারের আড়ালে মানুষের পাশে

ব্যক্তিজীবনে জাঁকজমক এড়িয়ে চলতে পছন্দ করতেন নানা পাটেকর। মুম্বাইয়ের ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে পুনের উপকণ্ঠে নিজের খামারবাড়িতে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। সেখানে কুকুর, গরু ও ষাঁড় নিয়ে নিরিবিলি জীবনযাপন করতেন বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।

সাধারণ পোশাক, সাদাসিধে জীবনযাপন এবং অর্থের প্রতি অনাসক্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উপার্জন করে কী লাভ, যদি মৃত্যুর পর কিছুই সঙ্গে নেওয়া না যায়।

অভিনয়ের বাইরে সমাজসেবায়ও সক্রিয় ছিলেন নানা। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত কৃষকদের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। সংগঠনটির মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক সংকট মোকাবিলা ও পানিসংরক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

নিজের সমাজসেবামূলক কাজ নিয়ে প্রচার পছন্দ করতেন না নানা। তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি নিজের আনন্দ থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ান; এমন কাজ আরও অনেকে করে থাকেন।

রান্নার প্রতিও ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। বলিউডে তাঁর হাতের রান্নার প্রশংসা ছিল। ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রয়াত অভিনেতা ঋষি কাপুর একসময় তাঁকে রেস্তোরাঁ খোলার পরামর্শও দিয়েছিলেন।

‘এই দীর্ঘ সফরে আমি শুধু পেয়েছি’

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি নানা পাটেকরের ব্যক্তিগত জীবনেও বিতর্ক এসেছে। তবে নিজের পথচলা নিয়ে আক্ষেপের কথা খুব একটা বলতেন না তিনি। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, জীবনের দীর্ঘ সফরে ক্ষতির হিসাব করেন না; মানুষের ভালোবাসা, দর্শকের স্বীকৃতি ও কাজের আনন্দই তাঁর কাছে বড় প্রাপ্তি।

মৃত্যুর পর মানুষ তাঁকে মনে রাখবে কি না, তা নিয়ে প্রত্যাশা না থাকলেও তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো দর্শকের স্মৃতিতে থেকে যাবে। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ ও ‘ওয়েলকাম’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয়, স্বতন্ত্র সংলাপ বলার ধরন, সাদাসিধে জীবন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প তাঁকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।

যে মানুষটি একসময় বলেছিলেন, মৃত্যুর পর কেউ কাউকে মনে রাখে না, তাঁর প্রয়াণেই আজ নতুন করে সামনে এসেছে তাঁর জীবন, কাজ ও মানবিকতার গল্প।

বিনোদন বিভাগের অন্যান্য খবর

 Somoyer Kotha
Follow Us

হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া

নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com

বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com

২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com