ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
নিউজ ডেস্ক :
প্রকাশিত : ০৩:১৩ এএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Digital Solutions Ltd

স্ত্রীর পরামর্শে ঘানি বসিয়ে খাঁটি তেলের ব্যবসা, সচ্ছল লস্কর পেলেন সম্মাননা

প্রকাশিত : ০৩:১৩ এএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছেলে হেলাল মিয়াকে নিয়ে ঘানিতে শর্ষের তেল উৎপাদন করছেন মো. লস্কর আলী।

নিউজ ডেস্ক :

সংসারে অভাব-অনটন ছিল। কীভাবে পরিস্থিতি বদলাবেন, তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন সুনামগঞ্জের মো. লস্কর আলী। তখন স্ত্রী ফুলজান বিবি তাকে ঘানিতে শর্ষের তেল ভাঙানোর পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শই বদলে দেয় তাদের জীবন। ৪৫ বছর ধরে ঘানিতে ভেজালমুক্ত শর্ষের তেল উৎপাদন করে এখন স্বাবলম্বী ৭১ বছর বয়সী লস্কর আলী। পেয়েছেন সম্মাননাও।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা নারায়ণতলা গ্রামে লস্কর আলীর বাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম ও শহরে তাঁর উৎপাদিত শর্ষের তেলের পরিচিতি রয়েছে। বয়সের কারণে ২৯ বছরের দফাদারের চাকরি থেকে অবসর নিলেও ঘানিতে তেল উৎপাদনের কাজ এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ছেলে হেলাল মিয়াও এখন বাবার সঙ্গে এ কাজে যুক্ত।

লস্কর আলীর বাপ-দাদার পেশা ছিল কৃষি। স্বাধীনতার পর নরসিংদী থেকে তাঁরা সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় এসে বসতি গড়েন। ১৯৮০ সালে ফুলজান বিবির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ফুলজানদের বাড়িতে আগে থেকেই ঘানিতে শর্ষের তেল ভাঙানোর কাজ হতো। ফলে কাজটি সম্পর্কে তাঁর ভালো ধারণা ছিল।

বিয়ের পর সংসারে অভাব দেখা দিলে স্ত্রীই লস্কর আলীকে ঘানিতে তেল উৎপাদনের পরামর্শ দেন। এরপর স্বামী-স্ত্রী মিলে শুরু করেন কাজ। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই—তেলে কোনো ধরনের ভেজাল না দেওয়া এবং ব্যবসায়ে সততা বজায় রাখা।

শর্ষের আবাদ, ফসল সংগ্রহ, শুকানো থেকে শুরু করে তেল উৎপাদন ও বিক্রি—সবকাজেই দুজন পরিশ্রম করতেন। লস্কর আলী নিজে বাজারে গিয়ে তেল বিক্রি করতেন। এখন তাঁর পরিচিতি এতটাই তৈরি হয়েছে যে অনেক ক্রেতাই বাড়ি থেকে তেল নিয়ে যান। শহরের নিয়মিত ক্রেতাদের কাছে নিজেই তেল পৌঁছে দেন তিনি।

বর্তমানে লস্কর আলীর বাড়ির একটি টিনের ঘরেই চলছে কাঠের ঘানি। ঘানিতে ঘোড়া ঘুরে, আর সেই ঘূর্ণনের চাপে শর্ষে থেকে বেরিয়ে আসে তেল। দিনে দুই দফায় কাজ করেন তাঁরা। প্রতি দফায় ১০ কেজি শর্ষে থেকে প্রায় ৬ কেজি তেল পাওয়া যায়। প্রতি কেজি তেল বিক্রি করেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়।

লস্কর আলী জানান, বছরে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার শর্ষে কিনে রাখেন। সুনামগঞ্জের ছাতক ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শর্ষে সংগ্রহ করেন তিনি। বর্তমানে প্রতি কেজি শর্ষে কিনতে খরচ হয় ৭৫ থেকে ৮০ টাকা।

তাঁর ভাষায়, ঘানির তেলের ব্যবসা সহজ নয়। এতে পুঁজি, শ্রম ও ধৈর্য—তিনটিই প্রয়োজন। ঘোড়ার সঙ্গে একজন মানুষকে কয়েক ঘণ্টা ঘানিতে সময় দিতে হয়।

এই ব্যবসার আয়েই একসময় সংসারে সচ্ছলতা আসে। বাড়ি করেছেন, জমি কিনেছেন, চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি ঘানির তেল উৎপাদন থেকেও এখন সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় হয় বলে জানান লস্কর আলী।

তবে এই পথচলার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর স্ত্রী ফুলজান বিবি। ২০১৯ সালে তিনি মারা যান। স্ত্রীকে স্মরণ করে লস্কর আলী বলেন, কাউকে ঠকানো যাবে না, তেলেও ভেজাল দেওয়া যাবে না—ফুলজান সবসময় এই কথাই বলতেন। তাঁর সেই শিক্ষা এখনো নিজের জীবনে ধরে রেখেছেন বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দারাও লস্কর আলীর তেলের প্রশংসা করেন। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কাছ থেকে তেল কিনলেও ভেজাল নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। শহরেরও তাঁর নিয়মিত ক্রেতা রয়েছে।

এই সততার স্বীকৃতিও পেয়েছেন লস্কর আলী। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন সমাজ উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকার জন্য ছয় উদ্যোক্তাকে সম্মাননা দেয়। বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পদ্ধতিতে খাঁটি শর্ষের তেল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে অবদানের জন্য সেই সম্মাননা পান লস্কর আলী।

সম্মাননা গ্রহণের সময়ও তিনি ব্যবসায়ে সততা ও কঠোর পরিশ্রমের পেছনে স্ত্রী ফুলজান বিবির অবদানের কথা স্মরণ করেন।

বাংলাদেশ বিভাগের অন্যান্য খবর

 Somoyer Kotha
Follow Us

হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া

নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com

বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com

২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com